আফগান নির্বাসিত নারী ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড সফর: নতুন আশার আলো
Contents
ক্রিকেটের রাজকীয় আঙিনায় আফগান নারীদের নতুন লড়াই
সব বাধা, নিষেধাজ্ঞা আর নির্বাসনের অন্ধকার পেরিয়ে আফগানিস্তানের নির্বাসিত নারী ক্রিকেট দল এক নতুন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আগামী মাসে ইংল্যান্ড সফরে যাচ্ছে এই অকুতোভয় নারী দল। এই সফরটি কেবল কিছু ক্রিকেট ম্যাচ খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং ক্রিকেটীয় স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। সফরের শেষভাগে তারা লর্ডসে অনুষ্ঠিতব্য নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের দর্শক হিসেবেও উপস্থিত থাকবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল স্রোতের সাথে যুক্ত করার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করবে।
আগামী ২২ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই সফরে আফগান রিফিউজি উইমেনস টিম (আফগান শরণার্থী নারী দল) বেশ কিছু অনুশীলন সেশন এবং টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অংশ নেবে। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)-র আয়োজনে এবং মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি), এমসিসি ফাউন্ডেশন ও ক্রীড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইটস গেম অন’-এর সার্বিক সহযোগিতায় এই ঐতিহাসিক সফরটি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
আশার আলো থেকে অন্ধকারের গ্রাস: আফগান নারী ক্রিকেটের অতীত ইতিহাস
আফগানিস্তানে নারী ক্রিকেটের যাত্রাটি কখনোই সহজ ছিল না, তবে ২০২০ সালের শেষের দিকে একটি বড় আশার আলো দেখা গিয়েছিল। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি) কাবুলে একটি বড়সড় ট্রায়ালের আয়োজন করে এবং সেখান থেকে ২৫ জন নারী cricketer-কে কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় নিয়ে আসে। এটি ছিল আফগান নারীদের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে তারা প্রথমবারের মতো পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল।
কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র নয় মাসের মাথায়, ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই আফগান নারী ও মেয়েদের খেলাধুলাসহ পাবলিক লাইফ বা সামাজিক জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। রাতারাতি মাঠের সবুজ ঘাস থেকে নির্বাসিত হন এই নারী ক্রিকেটাররা। খেলাধুলা করা তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে যায় এবং জীবন বাঁচাতে তাদের অনেককেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।
নির্বাসন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন করে বেঁচে ওঠা
দেশ ছাড়ার পর এই ক্রিকেটারদের অধিকাংশেরই বর্তমান ঠিকানা এখন অস্ট্রেলিয়া। এক বুক কষ্ট আর ক্রিকেটকে ভালোবেসে তারা সেখানে নতুন করে জীবন শুরু করেছেন। নির্বাসিত এই নারী দলটিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-র পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন ‘টিম ইন এক্সাইল’ বা নির্বাসিত দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে আইসিসি এখনো তাদের এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। আইসিসির স্বীকৃতি না পেলেও এই অদম্য ক্রিকেটাররা তাদের খেলা থামিয়ে দেননি।
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে তারা ক্রিকেটীয় কার্যক্রম সচল রেখেছেন। ২০২৫ সালের নারীদের অ্যাশেজ সিরিজের সময় অস্ট্রেলিয়ার মাঠে তারা ‘আফগানিস্তান রিফিউজি ইলেভেন’ হিসেবে ‘ক্রিকেট উইদাউট বর্ডারস’ দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত ৫০ ওভারের পুরুষ ক্রিকেট বিশ্বকাপেও তারা দর্শক হিসেবে উপস্থিত থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের নজর কেড়েছিলেন। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্রিকেটের প্রতি তাদের এই ভালোবাসা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
মেল জোনস ও ক্লেয়ার কনরের কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার এবং বর্তমানের জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার মেল জোনস আফগান নারী ক্রিকেটারদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি ক্রিকেট ভিক্টোরিয়ার ডাইভার্সিটি প্রধান এমা স্ট্যাপলস এবং পরামর্শক ড. ক্যাথরিন অর্ডওয়ের সাথে যৌথভাবে ‘ইটস গেম অন’ নামক একটি ক্রীড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। মেল জোনস এই সফরকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করলেও একই সাথে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বাস্তুচ্যুত এবং অবহেলিত নারী ক্রীড়াবিদদের সহায়তায় বিশ্ব ক্রিকেটকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
মেল জোনস বলেন, “এই খেলোয়াড়রা সবকিছু হারিয়েও ক্রিকেটের প্রতি যে অসামান্য সাহস এবং প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছেন, তা অবিশ্বাস্য। তারা বিশ্ব ক্রিকেট সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য এবং তাদের আরও সুযোগ পাওয়া উচিত। এই ধরনের মুহূর্তগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমাদের এই বছরের পরেও দীর্ঘমেয়াদী এবং অর্থপূর্ণ পদক্ষেপের পরিকল্পনা দেখতে হবে।”
can we have some words on behalf of ECB? অবশ্যই। ইসিবির ডেপুটি সিইও এবং ইংল্যান্ড নারী ক্রিকেটের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্লেয়ার কনর আফগান নারীদের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর থেকে এই খেলোয়াড়রা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যেভাবে তাদের ক্রিকেট যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাদের এই সহনশীলতা প্রশংসার দাবিদার।”
ক্লেয়ার কনর আরও যোগ করেন, “ক্রিকেটের একটি বড় দায়িত্ব হলো সবার অন্তর্ভুক্তি এবং সুযোগ নিশ্চিত করা। আমরা এই সফরের আয়োজন করতে পেরে এবং খেলোয়াড়দের ক্রিকেটের সাথে তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত।”
ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও বিশ্ব ক্রিকেটের দায়িত্ব
আফগানিস্তানের নির্বাসিত নারী ক্রিকেটারদের এই ইংল্যান্ড সফর কেবল খেলার মাঠের লড়াই নয়, এটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক জোরালো চিৎকার। তালেবান শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও তারা যে ক্রিকেটকে ভুলে যাননি, এই সফর তারই জীবন্ত প্রমাণ। তবে এই সফরের সফলতার পাশাপাশি আইসিসি এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ক্রিকেট বোর্ডগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে যাতে তারা এই নির্বাসিত খেলোয়াড়দের একটি স্থায়ী সমাধান এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ক্রিকেটের মূল বাণী যেখানে সমতা এবং ভ্রাতৃত্ব, সেখানে আফগান নারীদের এভাবে অবহেলিত রাখা পুরো ক্রিকেট বিশ্বের জন্যই এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। এই ইংল্যান্ড সফর আশা করা যায় বিশ্ব ক্রিকেটের নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দেবে এবং আফগান নারীদের ক্রিকেটের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত করবে।